অনলাইন নিউজ: দেশের গণতন্ত্রকামী ভোটারদের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ১৩ তারিখ থেকে নির্বাচিত এমপিরা আপনাদের দায়িত্ব নেবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আপনাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে কি-না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমি নেব ইনশাআল্লাহ। ১৩ ফেব্রুয়ারি যদি আপনাদের সমর্থন পাই তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির মূলমন্ত্র থাকবে মহানবী (সা.) মহান আদর্শ ‘ন্যায়পরায়ণতা। তাই ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গত সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের ৯০ ভাগের বেশি মানুষ মুসলমান। মহান আল্লাহর দরবারে আমাদের সবার একটিই প্রার্থনা, রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজবান নার। ‘হে আল্লাহ আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখেরাতে কল্যাণ দাও, আমাদের দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার রহমান সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপরে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এ কথাটি সন্নিবেশিত করেছিলেন। কিন্তু তাবেদার সরকার সংবিধান থেকে এই কথাটি বাদ দিয়েছিল। আল্লাহর রহমতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জনগণের রায় বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। এই কথাটি সংবিধানে পুনরায় সন্নিবেশিত করা হবে ইনশাআল্লাহ।
তারেক রহমান তার ভাষণে বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত বাংলাদেশ। সংবিধানে আছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু পতিত, পরাজিত, বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট চক্র জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা কেড়ে নিয়েছিল। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় হাজারো প্রাণের বিনিময়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার এক মাহেন্দ্রক্ষণ আমাদের সামনে উপস্থিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণতন্ত্রকামী জনগণের বহুল আকাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র রাজনীতি এবং সরকারে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই শুভ সময়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেÑ আমি আপনাদের সামনে কয়েকটি কথা বলতে চাই। গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে এমন একটি শুভ সময় হঠাৎ করেই আসেনি। এর জন্য বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল এবং গণতান্ত্রিক জনগণকে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী এই ধারাবাহিক আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষকে গুম-খুন অপহরণ করা হয়েছিল। আয়নাঘর নামক এক বর্বর বন্দিখানা যেন হয়ে উঠেছিল জ্যান্ত মানুষের কবরস্থান। শুধু ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ১৪ শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ। তিনি বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে অদ্যাবধি সব গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যারা শহীদ হয়েছেন তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবাদ ও তাঁবেদার অপশক্তি-বিরোধী বাংলাদেশ নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শাপলা চত্বরে গণহত্যা কিংবা সর্বশেষ ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ, ইতিহাসের এমন প্রতিটি বাঁকে হাজারো লক্ষ মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। একটি প্রাণের সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা আশা-আকাক্সক্ষারও মৃত্যু ঘটে। এই মানুষগুলো কেন এমন অকাতরে জীবন দিয়েছিলেন? কী ছিল তাদের চাওয়া? কোনো কিছু দিয়েই মৃত্যুর প্রতিদান হয় না। তাহলে কি এত প্রাণের বিসর্জন বৃথা হয়ে যাবে? না। অবশ্যই বৃথা যেতে দিতে পারি না। আমরা যারা এখনো আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি, আমাদের উচিত শহীদদের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা দেশ এবং জনগণের জন্য উৎসর্গকৃত সব প্রাণের প্রতিদান দেয়ার চেষ্টা করতে পারি।
তিনি বলেন, দেশের প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী, চার কোটির বেশি তারুণ্য, পাঁচ কোটির বেশি শিশু, ৪০ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ, কোটি কোটি শ্রমিক, কৃষক। এই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রই দুর্বল হয়ে পড়বে। নাগরিকদের দুর্বল রেখে রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ডেমোক্রেসি, ডেভেলপমেন্ট কিংবা ডিসেন্ট্রালাইজেশন কোনো কিছুই টেকসই হবে না। আমি মনে করি, জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত নাগরিকদের সরাসরি ভোটের অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্য পর্যন্ত প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা অর্জন প্রতিটি নাগরিকের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন একটি বড় সুযোগ। এই উপলব্ধি এবং বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশের নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টর এবং প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা আমাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছি। বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই চূড়ান্ত করা হয়েছে বিএনপির সব পরিকল্পনা। বিশেষ করে দেশের সব তরুণ-তরুণী, বেকার জনগোষ্ঠী, নারীদের জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই এবার বিএনপির প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।
ইশতেহারের বিষয়গুলো তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বেকার সমস্যা নিরশনের লক্ষ্যে ব্যাংক-বীমা-পুঁজিবাজারসহ দেশের অর্থনৈতিক খাতের সার্বিক সংস্কার অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং শিল্প ও বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কয়েকটি সেক্টরকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উপায় এবং কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশব্যাপী কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা হবে। কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় বিনামূল্যে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। যাতে করে বেকার যুবক কিংবা তরুণ-তরুণীরা দেশে-বিদেশে উচ্চ বেতনে চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন। প্রতিটি অঞ্চলভিত্তিক স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। স্থানীয় কুটিরশিল্প ও এসএমই খাত বিকশিত করার জন্য সহজ এবং স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। বৈষয়ক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে বেসরকারি শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সহায়ক উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং, ডাটা প্রসেসিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাক্টরসহ আইটি সেক্টরে নতুন শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এসব সেক্টরে প্রতিবছর সরাসরি দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি ও কন্টেইন ক্রিয়েশনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরো আট লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্ধেক জনশক্তির বেশি নারীশক্তিকে রাষ্ট্র রাজনীতি অর্থনীতির মূলধারার বাইরে রেখে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। দেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। যদি আপনারা বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন তাহলে আমরা এবার প্রথমবারের মতো দেশে প্রতিটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরিবারগুলোর নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করা হবে। তবে প্রথমপর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক এবং নি¤œআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ডে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা কিংবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ প্রয়োজন এবং বাস্তবতার নিরিখে পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। ফ্যামিলি কার্ডটিকে আমরা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে মনে করি।
বেগম খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার উন্নয়নে দেশের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ চালুর কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান সেই ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বাড়ানো হবে। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত নারী কল্যাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা নিশ্চিত করতে শুধু নারীদের জন্য বিশেষায়িত ইলেকট্রিক পরিবহন চালু করা হবে। কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্মস্থলে ডে-কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হবে। এছাড়া বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে নারীদের জন্য হাইজেনিক বাথরুম নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আমাদের সমাজের নারীরা নানাভাবে হয়রানি এবং সহিংসতার শিকার হন। বর্তমান সময় নারীর প্রতি সাইবার বুলিং উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বুলিংসহ নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত আমাদের রয়েছে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত অবশ্যই ইনশাআল্লাহ করা হবে।
কৃষকদের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে কৃষকের স্বার্থরক্ষার অর্থ দেশের স্বার্থরক্ষা। আমরা কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য কৃষকদের জন্য ফার্মাস কার্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছি। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক একদিকে কৃষিসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য পাবেন। অপরদিকে সরকারের কাছ থেকে পাবেন আর্থিক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। দেশে কোটি কোটি কৃষক শ্রমিক রয়েছেন। অধিকাংশই কর্মক্ষম। কর্মক্ষম কৃষকদের জন্য একদিকে যেরকম কর্মসংস্থান প্রয়োজন অপরদিকে প্রয়োজন তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
এছাড়া শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের গবেষণা এবং সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা কারিকুলাম পরিমার্জনের পরিকল্পনা, শিক্ষাস্তরের প্রতিটি ধাপে একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি একটি বিশেষ কারিগরি ব্যবহারিক শিক্ষার দক্ষতাও অর্জন করা, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য আমরা জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, জনগণের দৌড়গোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে। প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর। অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা কোর্স সম্পন্ন করিয়ে সারাদেশে এক লাখ হেলথকেয়ারার নিয়োগ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। নিয়োগ পাওয়া হেলথকেয়ারদের শতকরা ৪০ ভাগই হবেন নারী সদস্য। প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়া হেলথকেয়ারগণ মানুষের দোরগোড়ায় যাবেন এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দেবেন। আইসিটিকে দেশের অন্যতম থ্রাস সেক্টর হিসেবে চিহ্নিত করে ফ্রিল্যান্সিং এবং আউটসোর্সিংসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা করার নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে
তিনি আরো বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি শুধু পরিবার নয় রাষ্ট্রেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। আমরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ মসজিদের কয়েক লাখ খতিব-ইমাম মুয়াজ্জিন সাহেব রয়েছেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের রয়েছে ধর্মীয়, সামাজিক, আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক সম্পর্ক। এদের অনেকেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দেশের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং একইভাবে অন্য সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহযোগিতা ইনশাআল্লাহ আমরা নিশ্চিত করতে চাই।
পররাষ্ট্রনীতিতে বিএনপির কৌশলগত বার্তা
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য রক্ষা ও বহুমাত্রিক বিশ্ব বাস্তবতায় কৌশলগত কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে— এমনটা মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকারের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দেন তিনি।
বিএনপির বিগত শাসনামলে অর্থাৎ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের (২০০১–২০০৬) সময়ে যে কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল, তার মধ্যে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামে উদ্ধার হওয়া বিপুল অস্ত্রের চালান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয় চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটিতে, যেখানে সমুদ্রপথে দুটি বড় ট্রলারে করে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই ঘটনা ভারতের সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের সূচনা করেছিল। সে সময় ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি ছিল, ভারতের চাপের কারণেই অস্ত্রের চালান আটক করা হয়। অন্যথায় সেগুলো ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছাতে পারতো।
তবে বিএনপি বরাবরই বলে এসেছে, সরকারের নিজস্ব উদ্যোগেই ওই অস্ত্র জব্দ করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলেই বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।
সেসব ঘটনা স্মরণ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বিএনপির আগের শাসনামলে ভারত শুধু নয়, ভারতের বাইরেও আন্তর্জাতিক মহলে যে সেন্সেটিভিটি (স্পর্শকাতরতা) আছে, সেটা দূরীভূত করার জন্য এই অনুচ্ছেদটি দিয়েছে। আশা করি এটা শুধু কথার কথা না, এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগই বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।’
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে নানা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক প্রায় তলানিতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভালো কর্মসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটা অনেকটাই থমকে আছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
দিল্লি নতুন সরকারকে কীভাবে দেখবে এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গঠনে কতটা আগ্রহ দেখাবে—তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিসা জটিলতা বা একতরফা সম্পর্কের অভিযোগের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে পারস্পরিক আস্থা বাড়তে পারে।- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে সমাপনী ব্রিফিংয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার এলে দুদেশের সম্পর্ক আবারও ‘মসৃণ হবে’।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের পরে যে সরকারই আসুক না কেন তাদের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সহজীকরণ করা একটি চ্যালেঞ্জ বলে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘দিল্লি নতুন সরকারকে কীভাবে দেখবে এবং জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক গঠনে কতটা আগ্রহ দেখাবে—তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিসা জটিলতা বা একতরফা সম্পর্কের অভিযোগের মতো বিষয়গুলোতে পরিবর্তন এলে পারস্পরিক আস্থা বাড়তে পারে।’
তিনি মনে করেন, ‘পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উত্তেজনা কমবে।’
এ বিষয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দেশের ভেতরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—মানুষ এখন আরও বলিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায়। গত ১৫ বছরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের নিজস্ব প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ করাও সহজ হবে না।’
ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘বিএনপির ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। এমন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে বাংলাদেশে যে জনসমালোচনা রয়েছে, তা অনেকটাই কমে আসতে পারে।’
বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
বিএনপি ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার, নতুন বাজার ও বিনিয়োগ আকর্ষণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, মুসলিম বিশ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেছে। পাশাপাশি সফট পাওয়ার ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি বাড়ানো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা উন্নয়নের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইশতেহারে নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত ভারসাম্যের কথা থাকলেও মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন।
এবারের নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি পররাষ্ট্র বিষয়ের ওপর বেশ ডিটেইলসে কাজ করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ, পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—এসব বিষয় ইশতেহারে স্থান পেয়েছে।’
তবে তার মতে, ‘বড় প্রশ্ন হলো নীতিগত সমন্বয় কতটা কার্যকর হবে। বর্তমান বাস্তবতায় শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও নীতিগত বোঝাপড়া ও সমন্বয় জরুরি। এসব বিষয়ে ইশতেহারে তুলনামূলকভাবে কম বিস্তারিত রয়েছে।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দেশের ভেতরে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে—মানুষ এখন আরও বলিষ্ঠ ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায়। গত ১৫ বছরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের নিজস্ব প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।- বিইআই প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির
‘অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সমন্বয়ে নীতিনির্ধারণী, বাস্তবায়ন ও জনগণ পর্যায়—এই তিন স্তরের মধ্যে বাস্তবসম্মত উপলব্ধি, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্দেশনার সমন্বয় অপরিহার্য,’ বলে মত দেন হুমায়ুন কবির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি সবশেষ ক্ষমতায় ছিল প্রায় দুই দশক আগে। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বরাজনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে, আর বিএনপি ইশতেহারে সেই বাস্তবতা বিবেচনায় পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর চেষ্টা করেছে।’
তার মতে, পরিবর্তনশীল বিশ্বে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেশাদারত্ব ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। এখন আর গতানুগতিক কূটনীতির সময় নেই। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে সম্পর্কের মাত্রা নির্ধারণ করতে উচ্চমাত্রার দক্ষতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকেরা বলেন, যে কোনো ইশতেহারের মধ্যে সাধারণ বিষয়গুলো থাকে। যখন আসল কাজে যখন নামবে তখন হয়তো আরও বোঝা যাবে।
তবে বিএনপির ইশতেহারে যে বিষয়টা একেবারে স্পষ্ট সেটা হলো সম্পর্কে যেন মিউচুয়াল রেসপেক্ট, ডিগনিটি, সার্বভৌমত্ব বজায় থাকে। বাংলাদেশের জনগণের যে সমালোচনা ছিল সেটা কমে যাবে যদি সে ধরনের সম্পর্ক করা যায়।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২টি সংসদ নির্বাচন হলেও সবগুলোতে বিএনপি অংশ নেয়নি। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলের নেতৃত্ব নেন খালেদা জিয়া এবং পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তিনি নিজেই ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় সে সময় কোনো ইশতেহার দেওয়া হয়নি।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নিলেও খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় ইশতেহার ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনও বয়কট করেছিল দলটি।